শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন

অটিজম আসলে কোনো রোগব্যাধি নয়,অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত

J I
  • Update Time : ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৭২ Time View

অটিজম আসলে কোনো রোগব্যাধি নয়। এটা একটা স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যা। ১৯০০ সালের আগে এ শব্দটির আদৌ কোনো পরিচিত ছিল না। এ শব্দটি আমি যখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলাম ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত, আমি মেডিসিন বিভাগে অথবা শিশু বিভাগে কিংবা সাইক্রিয়াট্রি বিভাগে কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না বা আমার কোনো শিক্ষক এ শব্দটি শুনিয়েছেন তাও মনে পড়ে না। ১৯৮০-১৯৮৩ সালে আমি যখন মস্কোয় পিএইচডি করি, তখন আমার তিনটি অটিস্টিক শিশু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। যাদের তিনটিই ছিল পুরুষ শিশু, মানে ছেলে। যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা সমাজতান্ত্রিক দেশ অথবা জনকল্যাণমুখী দেশ ছিল, সেহেতু সেখানে তাদের লালন-পালনও অনেক ভালো ছিল। এ ছাড়া একটা প্রবাদ ছিল যে, ‘তুমি যদি তোমার শিশুকাল কাটাতে চাও, তা হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে যাও। যৌবন কাটাতে চাইলে ফ্রান্সে যাও। আর বার্ধক্য কাটাতে চাইলে ভারতবর্ষে ফিরে এসো।’ সত্যিই সোভিয়েত ইউনিয়নে শিশুদের ছিল একটা স্বর্গরাজ্য। প্রত্যেকটি শিশুর যত্ন শুধু যে তার মা-বাবা নিতেন তা নয়, সমাজ নিত, রাষ্ট্র তার দেখাশোনা করত। ওই তিনটি শিশুকেই আমি দেখেছি। তাদের মধ্যে একটি শিশু ছিল অঙ্কে অত্যন্ত পারদর্শী। আরেকটি শিশু ভালো চিত্রাঙ্কন করতে পারত। আর আরেকটি শিশু ছিল সে ভালো নাচ করতে পারত, ফিগার স্কেটিং করতে পারত। অর্থাৎ এদের যেদিকে ঝোঁক আছে, সেই দক্ষতার দিকে ঠেলে দিয়ে তাদের দক্ষ করে তোলা হয়েছে।

তার পর আমি যখন ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে আসি এবং একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি ১৯৮৪ সালে আমার প্রফেশন শুরু করি, তখন দেখলাম সমাজে অনেক শ্রুতিহীন অর্থাৎ যাদের আমরা বোবা ও বধির বলি। ওইসব শিশুকে নিয়ে মা-বাবারা আসেন। তখন শুনানি পরীক্ষার জন্য খুব ভালো উপকরণ ছিল না। আমরা আচরণবিধি ও শব্দের প্রতি শিশুর কী পরিমাণ আচরণ, চোখের মুভমেন্ট-এসব দেখে ডায়াগনসিস করতাম। যে রোগী কানে শোনে, কি শোনে না। আর শুনলে কীভাবে কথা বলতে হবে বা বলবে, না শুনলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু অটিস্টিক শিশু তখনই, আমার মনে চিন্তার উদ্রেক করত, যখন একটা শিশু শোনে কিন্তু সত্যিই কি সে অটিস্টিক না অন্য কিছু। যা-ই হোক, তার পর যখন ১৯৯২-৯৩ সালে অডিওলজিক্যাল মেডিসিন অর্থাৎ শ্রুতিবিদ্যার ওপর আমি ম্যানচেস্টারে এমএসসি করতে যাই, সেখানে অনেক শিশু দেখেছি Child Neurology, spech pathology & audiology বিভাগে যারা অটিস্টিক। সেই শিশুগুলোর ব্যবস্থাপনা বা পারফরম্যান্স কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৯৮৩ সালে দেখা শিশুদের মতো ছিল না। অর্থাৎ সোভিয়েত শিশুগুলো অনেক ভালো পারফর্মার ছিল।

অটিজম এমন একটা অসুখ বা এমন একটা সিনড্রম, যেটা বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকের কাছে বহুল পরিচিত এবং প্রচলিত হয়ে গেছে। পরিচিত পাওয়ার পেছনে যার সবচেয়ে বেশি অবদান তিনি হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে Center for Neurodevelopment and Autism in children, অর্থাৎ CNAC প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিই এবং প্রধানমন্ত্রী তা উদ্বোধন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে একজন সংগঠক হিসেবে আমরা প্রথম আন্তর্জাতিক অটিজম এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটির সম্মেলন করি ২০১১ সালের ২৫ জুলাই। সেখানে এক হাজারের মতো ডেলিগেট এসেছিলেন, অতিথিদের মধ্যে যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে স্বনামধন্যরা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি, সোনিয়া গান্ধী, শ্রীলংকার ফার্স্ট লেডি রাজাপাকসে ও মালদ্বীপের সেকেন্ড লেডি মিসেস এলহাম।

পত্রপত্রিকা, মিডিয়া অর্থাৎ এক কথায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রচারের সুবাদে অটিজম শব্দটি এখন বাংলাদেশে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। আগে যাদের পাগল বলে শিকলে বেঁধে রাখা হতো, আজকে কিন্তু তাদের ঘরের বাইরে আনা হচ্ছে। চিকিৎসককে দেখানো হচ্ছে, চিন্তা করা হচ্ছে এটি অটিজম কিনা। তার জন্য কী ব্যবস্থা আছে সেটি। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো যে, ওই ২০১১ সালের ২৫ জুলাই, যে সম্মেলটি ছিল সে সম্মেলন বাংলাদেশে একটি মৃদু ভূকম্পনের সৃষ্টি করেছিল, অর্থাৎ রিখটার স্কেলে হয়তো সেটা ৪ দশমিক ৫। যেখানে মানুষ নাড়া খেয়েছে, কেউ হতাহত হয়নি, দালান ধসে পড়েনি, বিবেক সচেতন হয়েছে। সামাজিক কুসংস্কার নাড়া খেয়েছে, খানিকটা স্তম্ভিত হয়েছে, কিছুটা হলেও দূরীভূত হয়েছে।

তার পর অটিজম নিয়ে আমার বস যিনি সূচনা ফাউন্ডেশনের বর্তমান চেয়ারপারসন। সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের অক্লান্ত পরিশ্রমে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের উপস্থাপনায় যে আইনগুলা পাস হয় তাও বাংলাদেশের কৃতিত্ব। সায়মা ওয়াজেদ হোসেন থেমে থাকেননি, তিনি আজও কাজ করে যাচ্ছেন এবং বর্তমানে বাংলাদেশে যেটুকু উন্নতি আমরা লক্ষ করছি, তার পেছনে এককভাবে ওনার অবদানই শতভাগ না হলেও নিরানব্বই ভাগ। দ্বিতীয়ত, মহাপরিচালক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ সম্পর্কিত অ্যাডভাইজরি বোর্ডের উপদেষ্টা হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে তার বক্তৃতা, বিবৃতি ও উপস্থাপনা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণকে বিশ্ববাসীর কাছে আরও বেশি পরিচিতি করে তুলেছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশের পাঁচ বছরের অগ্রগতি পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি এবং অনেকের কাছেই তা ঈর্ষণীয়।

তার পরও কিন্তু এই অগ্রগতিতে আমরা সন্তুষ্ট নই, আরও এগিয়ে যেতে চাই। অটিজমের শিশুগুলো বাহ্যিকভাবে দেখতে গেলে তাদের মধ্যে কোনো রকমের ত্রুটি আছে, তা বোঝা যায় না। কিন্তু আমরা যখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তখন তা আমাদের সামনে ধরা পড়ে। বাংলাদেশ এতই সচেতন হয়েছে, অর্থাৎ অ্যাওয়ারনেস এতই ডেভেলপ করেছে যে এখন অটিজমের শিশু বলতে গেলেই মনে হয় অথবা কোনো শিশু কথা না বললেই সবাই মনে করে যে অটিজম কিনা। আসলে এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অনেকভাবে অনেক আচার-ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করেই তাকে ডায়াগনসিস করতে হয়।

২০১১ সালের কনফারেন্সের পর সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের নেতৃত্বেই আমরা বাংলাদেশে প্রথম অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যায় কী পরিমাণ কাজ হয়েছে বা কী পরিমাণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে, তার একটা সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস করি। ২০১২ সালে আমরা ইন্টারমিনিস্ট্রিয়াল কলাবরেশন কমিটি গঠন করি এবং সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস রিপোর্ট সায়মা ওয়াজেদ হোসেন তখনকার প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমানের হাতে তুলে দেন। একই সঙ্গে ইন্টারমিনিস্ট্রিয়াল কমিটিতে প্রথমে আটটি মিনিস্ট্রি, পরে ১৪টি মিনিস্ট্রি নিয়ে ন্যাশনাল স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। যার অ্যাডভাইজর হলেন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল।

বর্তমানে আমাদের একটা ফাউন্ডেশন আছে। যে ফাউন্ডেশনের নাম সূচনা ফাউন্ডেশন, তার চেয়ারপারসন হলেন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন। তার নেতৃত্বে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের অগ্রগতির যে ঈর্ষণীয় দিক তার প্রমাণ কিছুদিন আগে ওয়াশিংটনে এ রকম একটি কনফারেন্স হয়, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থাৎ সূচনা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমি প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। আমাদের ছোট দুটি প্রেজেন্টেশনও ছিল। দলীয় চেয়ারপারসনের পক্ষ থেকে আমি সেটা উপস্থাপনা করি। Light it up blue-তে দেখালাম যে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, রাষ্ট্রপতির বাসভবন, সচিবালয়সহ হাইকোর্ট ভবন সবকিছু ব্লু লাইটে আলোকিত এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো নীল আলোয় প্রজ্বলিত। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বললেন এটাও কি সম্ভব হয়েছে। সত্যিই তারা হয়তো ভাবতে পারেননি যে, তাদের দেশের রাষ্ট্রপতির বাসভবন বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে ওই রকম আলোকিত করবেন নীল আলোর আভা দিয়ে। আমরা তা করতে পেরেছি, তার কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার পক্ষে ছিলেন।

আরও একটু মজার ব্যাপার হলো যে, এখন সূচনা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে চেয়ারপারসনের উদ্যোগে আমরা ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নে যে কংগ্রেস হচ্ছে, সেই কংগ্রেস চলাকালীন ৪ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করাব সে বইটি হলো বাংলাদেশের অটিস্টিক শিশুদের বিভিন্ন রকমের চিত্র ও আঁকা নিয়ে। অর্থাৎ তারাও যে সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী, তারাও যে একজন বড় চিত্রশিল্পী, অঙ্কনশিল্পী, সেই জিনিসটিই আমরা তুলে ধরতে চাচ্ছি। আমাদের এই প্রয়াস অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও কার্যত এটা মহৎ। অনেকের জন্যই হবে প্রেরণার উৎস।

এই প্রয়াসের ফলে অনেক অটিস্টিক মা-বাবা তাদের শিশুদের হয়তো বা চিত্রশিল্পী অথবা নৃত্যশিল্পী কিংবা কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। আজকের যুগে অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে আমরা দেখেছি আরও একটি আলোকিত উদ্ভাবন, সেটা হলো কিছু কিছু শিশু আছে, যারা কম্পিউটার সায়েন্সে এত পারদর্শী, নিজেরা নিজেরা এ কম্পিউটার চালানোতে, তারপর ডিজাইনিংয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত ডিজাইন তারা তৈরি করে নিয়ে আসছে।

পরিশেষে আমি মনে করি, সরকারের একার পক্ষে কখনো সম্ভব নয় সব সমস্যার সমাধান করা। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ লাখ ডিজঅ্যাবলড বা স্পেশালি অ্যাবলড শিশুর ইন্ডিভিজুয়ালি দেখাশোনা করার জন্য সমাজের বিত্তবান যারা আছেন, তারা যদি লভ্যাংশ না খুঁজে অর্থাৎ প্রফিট না খুঁজে সত্যিকার দাতব্য বলতে যা বোঝানো হয় সে কাজে এগিয়ে আসেন এবং শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা করে যান, তা হলেই সম্ভব। জেনে রাখা ভালো, অটিজম আক্রান্ত শিশু কখনো নিরাময় লাভ করে না। তাদের জীবন সাজিয়ে দিতে হয় মৃত্যু পর্যন্ত। সুতরাং অটিজম জয় করার জন্য আমাদের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা করতে হবে।

জয় হোক সব শিশুর

জয় হোক মানবতার।

অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


More News Of This Category