শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৪:৫২ অপরাহ্ন

শিরোনাম :

ট্রানজিট চুক্তির মাধ্যমে ভারত যেসব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তার বিস্তারিত বিবরণ

J I
  • Update Time : ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ১০৩ Time View

২০১০ সালের নভেম্বর মাসে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি সম্পাদিত হয়। তখন ভারতে ক্ষমতায় ছিলো কংগ্রেস সরকার। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। আর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুই প্রধানমন্ত্রী ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করলেও পরবর্তী কয়েক বছর এ ব্যাপারে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয় এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসে। ২০১৫ সালে দুইটি দেশ একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এই সমঝোতা স্মারক মোতাবেক চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অধিকার লাভ করে ভারত। এই সমঝোতা স্মারক মোতাবেক ভারত তার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ৩টি রাজ্যে পণ্য সামগ্রী প্রেরণের জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তিনটি রাজ্য হল ত্রিপুরা, আসাম এবং মেঘালয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত তার কৌশলগত সাতটি উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে অবশিষ্ট ভারতের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ২৪ বছর বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। সে সময় ভারতের অনুরোধ অথবা আব্দার রক্ষিত হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৩৯ বছর পর্যন্ত ভারতের আব্দার রক্ষিত হয়নি। বাংলাদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগ এবং মস্কোপন্থী কমিউনিস্টরা ছাড়া আর কোনো দল ভারতের ট্রানজিট দেওয়া সমর্থন করেনি। কারণ, বাংলাদেশের জনমত ভারতের ট্রানজিট দেওয়ার প্রবল বিরোধী ছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ র্দীঘ ১৯ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন মিত্র সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এই ধারণার বশবর্তী হয়ে ভারত সরকার ট্রানজিট পাওয়ার জন্য নতুন করে জোর তদ্বির শুরু করে। ভারতের ট্রানজিট দেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী সরকারের মনোভাব অনুকূল থাকলেও জনমতের প্রবল বিরোধীতার কারণে সেবার আওয়ামী লীগ ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ায় সাহসী হয়নি। তারপর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। বিএনপি ট্রানজিট দেওয়ার ব্যাপারে সব সময়ই বিরোধী ছিল।

এরপর এক এগারোর সরকার। তখন থেকেই ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের মনোভাব পরিবর্তন হতে থাকে। এক এগারো সরকারের প্রধান ফখরুদ্দিনের ভারত সম্পর্কে মনোভাব যাই থাকুক না কেন, ঐ সরকারের আসল শক্তি সেনাপ্রধান জেনারেল মইনুদ্দিনের মধ্যে ভারতঘেঁষা মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। জেনারেল মইনুদ্দিনকে আওয়ামী লীগের প্রতিও অনুরক্ত বলে প্রতীয়মান হয়।

দুই
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২০১০ সালে ভারতের ৬৩ বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সম্পর্কে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় । চুক্তি এবং স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও এগুলি বাস্তবায়নে অনেক আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন ছিল। মাঝখানে দুর্বোধ্য কারণে এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনে শ্লথ গতি লক্ষ করা যায়। এভাবে দেখতে দেখতে ২০১৯ সালের নির্বাচন এসে যায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সরকার যেরূপ আদা-পানি খেয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য তৎপর হয়, ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার আওয়ামী লীগের বিজয় চাইলেও কংগ্রেসের মত খোলামেলা হয়নি। আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলেও নরেন্দ্র মোদি পূর্ববর্তী সরকারের সমর্থন অব্যহত রাখে।

এই পটভূমিকায় চলতি মাসে ভারত বাংলাদেশ ট্রানজিট এবং বন্দর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনে তৎপর হয়ে উঠেছে। তাদের মালপত্র পরিবহনের জন্য তারা ইতোমধ্যেই অবকাঠামো, যথা রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু করেছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণ হলে ভারতের পশ্চিম প্রান্ত থেকে উত্তরপূর্বে মালপত্র পরিবহনের দূরত্ব অবিশ্বাস্য পরিমাণে কমে যাবে এবং তাদের পরিবহন খরচও বিপুল পরিমাণে বেঁচে যাবে। সরকারীভাবে ঘোষিত না হলেও জানা গেছে, চলতি মাসে (ডিসেম্বর) উভয় দেশের অফিসার পর্যায়ে যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে সেই বৈঠকেই স্থির হবে যে কোন কোন রুট ভারত ব্যবহার করবে এবং বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করার জন্য তাকে কি পরিমাণ মাশুল দিতে হবে। গত অক্টোবর মাসের ৩-৬ তারিখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লী সফরকালে ভারতকে চট্টগ্রাম এবং মংলা ব্যবহারের অনুমতি দেন। এর ফলে ভারত এখন বাংলাদেশের সড়কপথ, রেল পথ এবং নদীপথ দিয়ে তার পণ্য পরিবহণ করতে পারবে।

২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদি এবং শেখ হাসিনার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় তাতে ভারত যে নৌ ট্রানজিট পেল এর ফলে কলকাতা এবং মুর্শিদাবাদকে নদীপথে আসাম, ত্রিপুরা এবং মেঘালয়ার সাথে সংযুক্ত করা যাবে। ২০১৬ সালের জুন মাসে কলকাতা-আশুগঞ্জ-আখাউড়া নৌ রুট চালু হওয়ার পর মাত্র ১৩টি কার্গো জাহাজ ঐ পথে চালু করেছে। আর এতে বাংলাদেশের আয় হয়েছে মাত্র ২৮ লক্ষ টাকা। নৌ মন্ত্রণালয়ের অফিসাররা বলেন যে, ঐ সব রুটে রাস্তা এবং বন্দর নিয়মিত জাহাজ চলাচলের উপযোগী নয়। ৩ থেকে ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফরকালে রাজশাহী হয়ে মুর্শিদাবাদের ধুলন এবং ত্রিপুরার সোনাইমুড়ি নৌ রুট ব্যাবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৫ সালে ভারতকে চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের কোনো সমুদ্র বন্দর ছিলনা। অবিভক্ত বাংলায় একটি মাত্র সমুদ্র বন্দর ছিল। আর সেটা ছিল কলকাতা। পাকিস্তান তাই ভারতকে অনুরোধ করেছিল যে অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য পূর্ব বাংলাকে কলকাতা বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া হোক। এর মধ্যে পাকিস্তান চট্টগ্রামে সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করবে। জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত নেহরু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কংগ্রেসের জাঁদরেল নেতা সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেন যে, ছয় মাসের জন্য কেন,৬ ঘন্টার জন্যও পাকিস্তানকে কলকাতা বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। নেহরু এবং প্যাটেলের কথা আজকের প্রজন্ম নাও জানতে পারে, কিন্তু প্রবীণরা যারা জানেন তারা ভারতের সেদিনের এই বড়দাদাসুলভ আচরণ আজও ভুলতে পারেনি। ভারতের সেই দাম্ভিক আচরণের পরেও আওয়ামী সরকার ভারতকে ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম এবং মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দিয়েছে এবং শেখ হাসিনার গত অক্টোবর দিল্লী সফরের সময় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর স্বাক্ষর করেছে। এই স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি মোতাবেক, যে সমস্ত ভারতীয় পণ্য সামগ্রী চট্টগ্রাম এবং মংলা সমুদ্র বন্দরে এসে পৌঁছবে সেই সব পণ্য সামগ্রী স্থল, রেলপথ এবং নৌপথের মাধ্যমে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরা যাবে, তামাবিল হয়ে মেঘালয়ার ডাউকিতে যাবে, শেওলা হয়ে আসামের সুদাকান্দি যাবে এবং বিবির বাজার হয়ে ত্রিপুরার শ্রীমত্তপুরে যাবে।

তিন
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে, এসওপি শুধুমাত্র সমুদ্রবন্দর ব্যবহারেরই চুক্তি নয়, এটি ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহারের বিস্তারিত বিবরণ। এক এসওপিতেই রয়েছে নৌ, স্থল ও রেলরুট ব্যবহারের চুক্তি তথা অধিকার। স্থল পরিবেষ্টিত আসাম, মেঘালয়া ও ত্রিপুরায় চট্টগ্রাম এবং মংলা সমুদ্রবন্দরের একটি সংযোগ এবং সেটি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। ২০১৫ সালের চুক্তিতে ভারতীয় জাহাজকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টন মালামাল পণ্য পরিবহনের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন এসওপির মাধ্যমে ভারত আরও বড় জাহাজকে ২০০০ টনের চেয়ে বেশি মালামাল কম খরচে বাংলাদেশ ভূখন্ডের ওপর দিয়ে পরিবহন করতে পারবে।

এখানেই শেষ নয়। এই চুক্তির পর চট্টগ্রাম বন্দর ত্রিপুরার সাথে সংযুক্ত হবে। মাধ্যম হবে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সাঁকো। দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুম শহরের ওপর দিয়ে এটা যাবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর খাগড়াছড়ির রামগড়েরর সাথেও সংযুক্ত হবে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, ট্রানজিটের পূর্ব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের জন্য ভারত সাবরুমে রাস্তাঘাট এবং রেলপথ নির্মাণ করছে। এটাকে বলা হচ্ছে, উত্তর পূর্ব ভারতের মেগা উন্নয়ন।

বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকাকে গেøারিফাই করার জন্য এদেশের ভারতপ্রেমীরা বলেন যে, ভারত বাংলাদেশকে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ঋণ দিয়েছে। আপাত দৃষ্টে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার ফেলনা নয়। কিন্তু এই লাইন অব ক্রেডিট বা ঋণের ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে যে, দেশটি জাতে মাতাল, কিন্তু তালে ঠিক। বাংলাদেশকে ঋৃণ দিলেও তারা বাংলাদেশেরই হাত দিয়ে রেলপথ, স্থলপথ প্রভৃতি অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করাবে। যেগুলো আখেরে ভারতেরই কাজে লাগবে। অর্থাৎ যেসব রেলপথ ও সড়কপথ নির্মাণ করা হবে এবং নৌপথের সংযোগ করা হবে সেগুলির ওপর দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে ভারতীয় পণ্য পরিবাহিত হবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বন্দরে একটি বে কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে, মংলা বন্দরকে আরও উন্নত এবং আধুনিক করছে, রামগড়, বরুরহাট, কুমিল্লা- ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, সরাইল, আশুগঞ্জ নৌ বন্দর-সরাইল, আখাউড়া স্থল বন্দর নির্মাণ করছে। ভারতীয় ঋৃণের অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ আশুগঞ্জ ইনল্যান্ডে কন্টেনার নৌ বন্দর নির্মাণ করছে, খুলনা- দর্শনা রেলওয়ে জংশনের ডাবল লাইন তৈরি করছে এবং পার্বতিপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ লাইনকে ডুয়াল গেজ লাইনে উন্নীত করছে।

এমন কিছুই করা হচ্ছে ভারতীয় স্বার্থে। বাংলাদেশের জনগণ ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর দিতে রাজি ছিল না। তারপরেও তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই সরকার যখন ভারতকে করিডোর দিয়েই দিয়েছে তখন বেলা শেষে বাংলাদেশ গানের কথায় প্রশ্ন তুলতেই পারে, ‘তোমাকে ভালবেসে আমি অবশেষে কি পেলাম।’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


More News Of This Category